ছবিঃ প্রদীপ প্রজ্জলন

রাঙ্গামাটি রাজবনবিহার তথা বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারসমূহে শুরু হতে চলেছে মাসব্যাপি আকাশ প্রদীপ প্রজ্জলন উৎসব। এর পূর্বে অনুষ্ঠিত হয়েছিল একমাস ব্যাপি কঠিন চীবর দানোৎসব। এই উৎসবে মেঠে উঠেন পুরো পার্বত্য বৌদ্ধবাসী। কথিত আছে- একসময় ভগবান বুদ্ধ সম্যক সম্বোধি লাভ করার পর নৈরঞ্জনা নদীর তীরে এইরুপ সত্যক্রিয়া করেছিলেন- “যদি আমি সত্যি সম্যক সম্বোধি জ্ঞান লাভ করে থাকি তবে আমার এই সত্যক্রিয়া দ্বারা আমার চুলগুলো নিচে না পরে আকাশের দিকে উড়ে যাক”। এইরুপ সত্যক্রিয়া করার পর বুদ্ধ তার দীর্ঘচুলগুলো কেটে আকাশের দিকে উড়ে দেন। দেবরাজ ইন্দ্র স্বর্গ থেকে ভগবানের চুলগুলো আকাশের দিকে উড়ে আসতে দেখলে তা তিনি নিয়ে যান এবং সাত যোজন উচ্চতা বিশিষ্ট্য মন্দির নির্মাণ করে সেখানে দেবতারা পূজো করতে শুরু করেন। সেই উদ্দেশ্য বৌদ্ধরাও একমাস ব্যাপি আকাশ প্রদীপ প্রজ্জলন করে থাকেন।

ছবিঃ আকাশ প্রদীপ উত্তোলন
প্রথমে প্রদীপ জ্বালিয়ে একটি গাথা পাঠ করা হয়। গাথাটি নিম্নরূপঃ

যত যত দান আছে, আনন্দ সকল পুছে,
নিস্তার করিতে জীবগণ।
দয়া কর সেবকরে, ইচ্ছা বড় শুনিবারে,
কৃপা করি করহ্‌ বর্ণন।
তোমার মহিমা যত, তা বা কহিব কত,
তুমি প্রভু সবার তারন।
সাগর অবধি যত, পাপীগণ শত শত,
মুক্তি সবে কর বিতরণ।
তুমি কৃপা কর যারে, সেই জন চলে চত্বরে,
কিবা স্বর্গ নির্বাণের ঠাঁই।
তুমি যে চালাও যথা, জীব সব চলে তথা,
তুমি ভিন্ন আর কেহ নাই।
তুমি শশী, তুমি রবি, তুমি জ্ঞানী, তুমি যোগী,
বৈদ্যরূপী তুমি ভগবান।
তুমি কৃপা কর যারে, সে যায় নির্বাণ পাড়ে,
ছাড়াইয়া ভবের বন্ধন।
ধর্ম পুরাবৃত্ত কথা, শ্রবণে অমৃত গাথা,
পদ বন্ধে করি বিচরণ।
আনন্দ কহিল যদি এতেক স্থবন,
কহিতে লাগিলে বুদ্ধ প্রফুল্ল বদন।
আর এক কথা বলি শুন দিয়ে মন,
বুদ্ধের সম্মুখে দীপ দিবে যেই জন।
ঘৃত তৈল অথবা যে দিবে মোমবাতি,
যেবা দিবে তিল তৈল শুন তার কীর্তি।
তিন কল্প থাকে সেই ইন্দ্রের নগরে,
বহুবার চক্রবর্তী রাজা হবে সংসারে।
কার্তিকের চাঁদে দিবে আকাশ প্রদীপ,
শত কল্প থাকে সেই ব্রহ্মার সমীপ।
দিব্যজ্ঞান দিব্যচক্ষু দিব্য কলেবর,
নরকুলে জন্মে সেই হয়ে সাধুনর।
হীনকুলে জন্ম না হবে কোনো কালে,
চক্রবর্তী রাজা হবে এই মহিমণ্ডলে।
আকাশ প্রদীপ যে মানব তুলিবে,
কোনো কালে সেইজন নরকে না যাবে।
অন্তকালে যাবে সেই ব্রহ্মার ভূবন,
কতেক কহিব তাঁর পূণ্যের কথন।
এত শুনি রাহান্তারা করে জিজ্ঞাসন,
আকাশ দিবে কীসের কারণ।
সেই কথা বিস্তারিয়া কহ মহাশয়,
তব মুখে শুনি সব ঘুচিবে সংশয়।
রাহান্তাগণের এত শুনিয়া বচন,
কহিলেন শ্রী আনন্দ কথা পুরাতন।
দেবপুরে চূড়ামণি নামে চৈত্য আছে,
আকাশ প্রদীপ দেওয়া সেই চৈত্যের কাছে।
সংসার ত্যজিয়া যবে বুদ্ধ ভগবান,
রাত্রি যোগে করিলেন কাননে প্রস্থান।
প্রভাতে অনোমাতীরে হয়ে উপনীত,
কাটিল চিকুর তরবারে হস্ত স্থিত।
হস্তে লইয়া সেই চুল উর্ধ্বে উড়াইল,
কুসুম ঝরের মর উঠিত লাগল।
অন্তরিক্ষে থাকি তা দেখে পুরন্দর,
সাদরে লইয়া গিয়া আপন নগর।
বিহার যোজন সপ্ত উচ্চ পরিমাণ,
চুল স্থবিবারে ইন্দ্র করিল নির্মাণ।
নানা চিত্র-বিচিত্র করে সুগঠন,
সেই বিহারে বুদ্ধ কেশ করিল স্থাপন।
চূড়ামণি বলি নাম বিখ্যাত হল,
যত দেবগণ মিলি এই নাম রাখিল।

এই গাথাটি শেষ হলে তারা আরও একটি প্রার্থনা পাঠ করেন।