ছবিঃ লাখো বৌদ্ধ জনতা

প্রতি বছরের ন্যায় এবছরও লাখো বৌদ্ধ জনতার দল নেমেছে রাঙ্গামাটি রাজবন বিহারে। রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও দেশ-বিদেশসহ অসংখ্য পূণ্যার্থী অংশগ্রহণ করেন এই দিনে। এই বছরও গত ৭-৮ নভেম্বর ২০১৯ সালে রাঙ্গামাটি রাজবন বিহারে ৪৬তম দানোত্তম কঠিন চীবরদানে জড়ো হন লাখো পূণ্যার্থী। এই দিনে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, দেশ, কাল, পাত্র নির্বিশেষে সকলে জোগদান করে বলে অনেকে এই দিনকে মহামিলন মেলা বলে অভিহিত করেন।

বৌদ্ধ ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এইরকম পূণ্যানুষ্ঠান প্রথম প্রবর্তন করেন গৌতম বুদ্ধের সময়ে পূণ্যবতী মহাউপাসিকা বিশাখা। কথিত আছে – সেই সময় বর্ষাবাসে কয়েকজন বুদ্ধের শিষ্যবর্গ ছেড়া বস্ত্র পরিধান করে পিন্ডচরন করতেন। একদিন বিশাখা পিন্ডচরন দিতে গিয়ে ভিক্ষুদের এই দুর্দশা দেখেন এবং মনে মনে লজ্জা পান। তিনি এই বিষয়ে বুদ্ধের কাছে আলাপ করার জন্য গেলে বুদ্ধ তাকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে তুলা থেকে সুতা, সুতা থেকে কাপড়, কাপড় থেকে চীবর বানানোর পরামর্শ দেন। বুদ্ধের নির্দেশে বর্ষাবাস সমাপ্তির পরে বিশাখা প্রথম এই কঠিন চীবর দানটি চালু করেন।

ছবিঃ কল্পতরুসহ র‍্যালি আয়োজন

আর বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে এটি প্রথম চালু করেন সাধনানন্দ মহাস্থবির(বনভান্তে) ১৯৭৩ সনে লংগদু তিনটিলা বনবিহারে। সেই থেকে রাঙ্গামাটি রাজবন বিহারসহ বিভিন্ন শাখা প্রতিষ্ঠানে এই দানটি আয়োজন করা হয়। সকাল পর্বের অনুষ্ঠানে প্রথমে উদ্বোধনী সংগীত পরিবেশন, পঞ্চশীল গ্রহণ, বিবিধ দান, উতসর্গ ও সূত্র পর্ব শেষ হলে প্রথমে বক্তব্য রাখেন পটুয়াখালী কলাবাগান থেকে আগত বাংলাদেশ কৃষক লীগ সাধারণ সম্পাদক নিউ নিউ কে।

তিনি বলেন- আমি অর্হত ভান্তে(বনভান্তেকে) নিয়ে শ্রদ্ধান্বিত হয়েছি। আমার কখনো ভান্তের সাথে দেখা হয়নি। সেই প্রথম ২০১২ সালে ঢাকায় স্কয়ার হাসপাতালে পরিনির্বাণের দিনে মিথিলা চাকমা পরিচয় করান। এখনও আমার মনে আছে আমাদের বাসা(ঢাকায়) থেকে স্কয়ার হাসপাতালে যেতে সময় লাগত ৪৫ মিনিট। কিন্ত সেইদিন আমাদের সময় লেগেছে মাত্র ১৫ মিনিট। সেই থেকে আমার অর্হত বনভান্তের প্রতি শ্রদ্ধা জাগরিত হয়েছে। এরপর বক্তব্য রাখেন ভারত মহারাষ্ট্র থেকে আগত ইন্ডিয়া গভর্নমেন্টর রেলওয়ে সচিব বিজয়নেসাং। তিনি বলেন- আমি খুবই আনন্দিত ভারত ও সারাবিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও বৌদ্ধ ধর্ম বিদ্যমান রয়েছে এবং অনুশীলন করা হচ্ছে। বনভান্তের প্রতি ও ভিক্ষুসংঘের প্রতি তিনি সম্মান প্রদর্শন করেন।

ছবিঃ রাজবন বিহারের ছিমিতং ঘর

তারপর বক্তব্য প্রদান করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রাক্তন উপমন্ত্রী বাবু মনিস্বপন দেওয়ান। তিনি বলেন- বৌদ্ধ ধর্ম হল যুক্তিবাদী ধর্ম ও জ্ঞানীর ধর্ম। এই ধর্ম অনুমান ও আন্দাজের ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য নয়। বুদ্ধ নিজেই বলেছেন- এস দেখ, যেগুলো তোমার ভালো মনে হয় সেগুলো গ্রহণ কর আর যেগুলো তোমার খারাপ মনে হয় সেগুলো বর্জন কর। তিনি রাজবনে বিশ্বশান্তি প্যাগোডাটি নির্মাণের জন্য সকল দায়ক-দায়িকা ও বাংলাদেশ সরকারকে সুদৃষ্টি দেওয়ার আহবান করেন।

সকাল পর্বের অনুষ্ঠানের শেষান্তে সকল প্রাণীর হিতসুখ মঙ্গলার্থে যথাক্রমে দেশনা প্রদান করেন জ্ঞানপ্রিয় মহাস্থবির, ইন্দ্রগুপ্ত মহাস্থবির ও বিশুদ্ধানন্দ মহাস্থবির প্রমুখ।

জ্ঞানপ্রিয় মহাস্থবির ভান্তে বলেন- এই পঞ্চস্কন্ধ(রুপস্কন্ধ, বেদনাস্কন্ধ, সংজ্ঞা স্কন্ধ, সংস্কার স্কন্ধ, বিজ্ঞানস্কন্ধ) সবই অনিত্য, দুঃখ ও অনাত্না । মূহুর্তের মধ্যে উদয় হচ্ছে আর মূহুর্তের মধ্যে বিলয় হচ্ছের এই পঞ্চস্কন্ধ যা অজ্ঞানশত অন্ধ মানব তাহা পর্যবেক্ষন করতে পারে না। কঠিন চীবরদানের ফলে কি কি পারমী পূর্ণ হয় ভান্তে তা সংক্ষিপ্তকারে তুলে ধরেন।যথা-

সম্যক সম্বুদ্ধ হওয়ার পারমী পূরণ হয়।
পচ্চেক বুদ্ধ হওয়ার পারমী পূরণ হয়।
শ্রাবক বুদ্ধ হওয়ার পারমী পূরণ হয়।
চক্রবর্তী রাজা হওয়ার পারমী পূরণ হয়।
পরিশষে প্যাগোডা নির্মাণ করলে কি কি ফল লাভ করা যায় তা থাইল্যান্ড থেকে ডিজাইনকৃত কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের উত্তর তিনি সকল পূণ্যার্থীদেরকে বলেন-

০১। যেই দেশে প্যাগোডা নির্মাণ হবে সেই দেশ উন্নতি হবে।
০২। প্যাগোডা নির্মাণ করলে সুখ বয়ে আসবে।
০৩। জন্মে জন্মে ভূমি অধিকার হারা হয় না।

কাটাছড়ি রাজবন ভাবনা কেন্দ্র থেকে আগত ইন্দ্রগুপ্ত মহাস্থবির ভান্তে বলেন- বিশুদ্ধ ও পরিপূর্ণ পূণ্য ফল লাভ করতে চাইলে আগে সেই বিষয়ে বিশেষ জ্ঞান ও বিশ্বাস থাকতে হবে। কিসে জ্ঞান? চারিআর্যসত্য ও প্রতীত্যসমুতপাদ নীতি জ্ঞান। কিসে বিশ্বাস? কর্ম-কর্মফলের প্রতি বিশ্বাস, ইহ-পরকালের প্রতি বিশ্বাস। বুদ্ধ বলেছেন- স্বত্ব দুইভাবে পূণ্য কর্ম করেঃ

০১। জ্ঞানসম্প্রযুক্ত সংস্কারক চিত্তেঃ যারা নিজে নিজেই শ্রদ্ধা, বীর্য, স্মৃতি, একাগ্রতা ও প্রজ্ঞা উতপন্ন করে পূণ্য করে তাকে বলা হয় জ্ঞানসম্প্রযুক্ত সংস্কারক চিত্তে পূণ্য করা। এরাই প্রকৃত পূণ্যফলের অধিকারী হন।
০২। জ্ঞানসম্প্রযুক্ত অসংস্কারক চিত্তেঃ যারা অপরের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে পূণ্য কর্ম করে তাকে বলা হয় জ্ঞানসম্প্রযুক্ত অসংস্কারক চিত্তে পূণ্য করা। এরা যেকোনো সময় পূণ্য থেকে চ্যুত হতে পারে।

ভান্তে সবাইকে জ্ঞানসম্প্রযুক্ত সংস্কারক চিত্তে দান শীল ভাবনা করার জন্য অনুরোধ করেন।

নানিয়াচর রত্নাংকুর বনবিহার থেকে আগত বিশুদ্ধানন্দ মহাস্থবির ভান্তে বলেন- বনভান্তের জীবিতকালীন যেই পূণ্যটি ছিল পরিনির্বাণের পরও তার একই পূণ্য আছে। তিনি জীবিতকালীন যেই সত্যবাক্যগুলো উপদেশ দিয়েছেন এখনও কেউ সেই অনুসারে প্রতিপালন করলে তার সুখ হবে, মঙ্গল হবে।
ছবিঃ রাজবনে নির্মানাধীন বিশ্বশান্তি প্যাগোডা