আমরা যে মুহুর্তে কোনো বিপদ বা বিপত্তির সন্মুখীন হই। তখন সাত-পাঁচ না ভেবে বুদ্ধের ধর্মের ও সংঘের শরণাপন্ন হই। কেননা ত্রিশরণই আমাদের অনন্য শরণ। আমাদের বিশ্বাস যে, ত্রিশরণই আমাদের সংকট মূহুর্তের একমাত্র অবলম্বন। আমাদের সমাজ-কাঠামো সত্যিই এক বিপদ-বিপত্তির সন্মুখীন। অনৈক্য অসহন শীলতা, অবিশ্বাস, আর্থ-সামাজিক অবক্ষয়, রাজনৈতিক বিপর্যয় চোখে পড়ার মতো। এমতাবস্থায় আমাদের সমাজের সচেতন এলিট শ্রেণীর দিকে তাকালে মনে হয় বিরাজমান সংকট উত্তরণের কোনো অবলম্বন যেন তাদের জানা নেই। এভাবে সমাজের চলৎ শক্তি যেভাবে ফুরিয়ে যাচ্ছে, তাতে হতাশার সুরে কেন যেন বলার সাধ জাগে- কান আছে, শুনি না। চোখ আছে, দেখি না। মুখ আছে বলি না।

ছবিঃ টিএফবিকে এখন দেখা যাচ্ছে

পরমপূজ্য বনভন্তের পথে ত্রিশরণ ফাউন্ডেশন তার স্বপ্নমাত্রায় নেমেছে। তা’নিয়ে আজ নানা মুনির নানা মত। সব মত গঠন মূলক কিনা ভেবে দেখার অবকাশ রয়েছে। আমি শুধুই বলি- ত্রিশরণ ফাউন্ডেশনের কথাগুলো একটু আমলে নিন। মনোযোগকে বাদ দিয়ে ভাসা ভাসা ভাবে ত্রিশরণ ফাউন্ডেশনের কথা শোনা আর না শোনা একই কথা। তা’ছাড়া ধর্মীয় উন্নয়নমূলক সংস্থা হিসেবে ত্রিশরণ ফাউন্ডেশনকে দাড় করাতে যাওয়াটা এত সহজ কাজ নয়। শ্রদ্ধেয় জিনবোধি মহাথের (ভন্তে) অতি কষ্টে সংস্থাটির হাল ধরে রেখেছেন। তার নিঃস্বার্থ, সুদুর প্রসারী চিন্তাধারা, অটুট নিষ্ঠা ও মনোবল যে আমাদের সমাজের ঘুমন্ত আত্নাকে জাগরণী গানে বিমুগ্ধ করছে- তা’কি নয়?শ্রদ্ধেয় জিনবোধি ভন্তের কর্ম শক্তিকে আরো শাণিত করা মানে যে ত্রিশরণ ফাউন্ডেশনের কথা আমলে নিয়ে যথাসাধ্য সহযোগিতা দেয়া তা’কি নয়?

আমরা বৌদ্ধ সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হবার সুযোগ চাই। সুযোগ মানেই অনুকুল পরিবেশ। এই পরিবেশ গড়ার প্রাথমিক শর্তগুলো হল- ১। ধর্মীয় কার্যক্রমকে কোনঠাসা করে রাখার কৌশল হিসেবে বিহারের চৌহদ্দিতে বৌদ্ধ সংস্কৃতিকে বন্দি করে না রাখা, ২। বৌদ্ধ সংস্কৃতিকে আপন করে নেয়া, ৩। বৌদ্ধ ভাবাদর্শকে পুরোপুরি মেনে নিতে পারা বা সমাজ প্রগতির পক্ষে ধর্মকে নেতিবাচক বা অপ্রয়োজনীয় মনে না করা, ৪। বৌদ্ধ সাংস্কৃতিক শিক্ষাহীন বৌদ্ধ সমাজ যে অচল, তাতে অস্বীকৃতি না দেয়া। অত্যন্ত দুঃখজনক যে, আমাদের পাহাড়ের বৌদ্ধ বলয়টির আজ দিশেহারা। যেন গাছের গোড়ায় পানি না ঢেলে গাছটির আগায় পানি ঢালার ন্যায় একালের কথা না ভেবে পরকালের কথায় মশগুল। পূণ্যকর্ম, দান, ধর্ম। ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি হয়ে উঠছে স্বর্গ-মোক্ষ প্রত্যাশ কেন্দ্রিক। আর এই সু্যোগে আমাদের বৌদ্ধ জনতার একাংশ বৌদ্ধ ধর্মাচরণকে যেমন উৎসাহিত করছে না তেমন নিরুৎসাহিতও করছে না। ফলশ্রুতিতে সমাজের শেখর হায় হায়, নাই নাই। তাই সমাজের এই পরিহানী ঠেকাতে পরম পূজ্য বনভন্তের সমাজ পরিবর্তন মূলক কার্যক্রমের ধারা’র লালনে ত্রিশরণ ফাউন্ডেশন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে চায়।

বুদ্ধ হলেন প্রজ্ঞাসূর্য। এই সূর্যালোকে উদ্ভাসিত বৌদ্ধজনতা যে মার্গ বা রাস্তা ধরে চলবে তা-ই ধর্ম। এই ধর্মকে সংক্ষেপে আর্য অষ্টাংগিক মার্গ বলা হয়। এই মার্গের অনুসারীদের সমষ্টিগত নাম- সংঘ। সমাজ শব্দের নামান্তর হলো সংঘ। সংঘের অন্যতম লক্ষ্য নির্বাণ হলেও তা’ একমাত্র লক্ষ্য বলে মনে হয় না। বুদ্ধের শাসন রক্ষায় তারা “শাসন সেনা”। আত্ননিবেদিত হবেন বুদ্ধধর্মের পরিহানী রোধে। নিজেদের মেধা, মনন উজাড় করে দেয়ার মাঝে উৎসারিত আনন্দময় কর্মযাত্রার অভিব্যক্তি-ই তাই বৌদ্ধ সংস্কৃতি। পরম পূজ্য বনভন্তে এই বৌদ্ধ সংস্কৃতির পথেই সমাজ পরিবর্তনে বিশ্বাসী ছিলেন। তার জীবদ্দশায় ত্রিশরণ ফাউন্ডেশনের পাশাপাশি রাঙ্গামাটি বৌদ্ধ সাংস্কৃতিক একাডেমি (আরবিসিএ) কেও অনুমোদন দিয়েছিলেন। পাহাড়ের বৌদ্ধ বলয়টির একমাত্র বৌদ্ধ মুখপত্র “বোধিধারা”’র সংখ্যাগুলো তিনি আন্তরিকতার সাথে দেখতেন। তাই অনুরোধ করি যে, “বোধিধারা”র সাথে থাকুন। ত্রিশরণ ফাউন্ডেশনকে জানুন। বনভন্তের স্বপ্ন গাথা- পরিপূরণে ভূমিকাবান হোন।