ছবিঃ সুগত চাকমা (ননাধন)’র সাথে কিছুক্ষণ
আপনার সুলিখিত কবিতা ভাণ্ডার মননশীলদের বেশ আকৃষ্ট করে। “হি অব হিজেনি?” কবিতাটি আপনার দূরদর্শিতা প্রসূত। আপনার আরও কবিতা অপ্রকাশিত আছে কিনা? আর সেগুলো প্রকাশ করবেন কি?

সুগত চাকমাঃ উপরোক্ত কবিতাটির ব্যাপারে আপনাদের মননশীল মন্তব্য ও প্রশংসা যোগ্য। তবে কবিতার নামকরণের ভাবার্থের জন্য বিশ্বখ্যাত ইংরেজ কবি ও নাট্যকার শেক্সপীয়রের বিখ্যাত লাইন “To be or not be this is the question” ই শ্রদ্ধাযোগ্য বিষয়।

অনেক বৌদ্ধ ধর্মীয় গান, কবিতা, প্রবন্ধ লিখেছেন। তৎমধ্যে অহিংসা ধর্মের পধে আদি যেই গানটি বেশ শ্রোতা প্রিয়। আমরা আপনার কাছ থেকে আরও ধর্মীয় গান কবিতা পেতে চাই। আমাদের আশস্ত করবেন কি?

সুগত চাকমাঃ উপরোক্ত গানটির প্রতি মৈত্রীপূর্ণ মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ জানাই। ১৯৭৪ সালে “আমা জাগা আমা ঘর, আমা মোনঘর” গানটি আজও সেই থেকে মোনঘর শিশুসদনে শিক্ষার জন্য আশ্রয় প্রাপ্ত শিশুরা গেয়ে থাকে। এতে দূর ও কাছ থেকে আমিও ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে আমিও এভাবে আশ্বস্ত হয়ে আসছি যে, বুদ্ধ পূজি সুখ পেবং, সর্ব দুঃখ পার অবং, সর্ব কালত তরিবং, পূণ্য পেবং জনমভর।

কবি ফেলা যেয়ে, দীপংকর শ্রীজ্ঞান, অমর শান্তি ও অন্যান্যদের পরবর্তী জেনারেশনের যুগকে রেনেসার যুগ বলা কি যুক্তিযুক্ত? কেননা আশির দশকের এই পরিক্রমায় বেশ কয়েকটি সাহিত্য সংগঠনের জন্ম হলেও পরের দশকে এই কল্লোলিত ধারা স্তিমিত হয়ে যায়। আজকের দিনে যেই শূণ্যতা বিরাজ করছে তাতে করণীয় কী? নাকি চুপিসারে নিজেদের আত্নবিসর্জন প্রত্যক্ষ করাকে নিয়তি বলে মেনে নেওয়া সমুচিত?

সুগত চাকমাঃ চাকমা ভাষায় লেখা কবি দীপংকর শ্রীজ্ঞানের বই ‘পাদারঙ কোচপানা’, কবি ফেলা যেয়ে-র কবিতা ‘জুম্মবী পরানী মর’ রাঙ্গামটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সম্মাননা প্রাপ্ত গীতিকাব্য অমর শান্তি চাকমার “উত্তম পেগে মেঘে মেউল দেবা-তলে” এ জাতীয় গান নিকট ও দূরের অন্যান্য বহু খ্যাতনামা লেখক ও জনপ্রিয় চাকমা কবি, গীতিকার, নাট্যকার ও গল্প লেখক সত্তরের দশকে চাকমা ভাষা আদিত্যের অগ্রগতি ও উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিলেন। তাই ৭০ এর দশকের চাকমা সাহিত্যের কাল অবশ্যই একটি মহেন্দ্রক্ষণ বলতে হয়।

আমাদের সমাজে হতাশার শেষ নেই। সৃজনশীল কার্যক্রমগুলো সমাজে প্রভাব ফেলতে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। গুণী-জ্ঞানীরা উপেক্ষিত হবার পথে। আপনি কি এই হতাশার মাঝে আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন?

সুগত চাকমাঃ সাম্প্রতিক একটি গবেষণা থেকে জানা গেছে, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলাতে শতাধিক চাকমা অধ্যাপক সরকারি ও বেসরকারি কলেজ গুলিতে অধ্যাপনা করে ছাত্র-ছাত্রীদেরকে ভাল ভাল শিক্ষা দিচ্ছেন; গবেষণাকালে শহরাঞ্চলে একটি চাকমা গ্রামের ৫০টি বাড়িতে ১২৯টি মোবাইলতোন পাওয়া গেছে। ঐ গ্রামে ৩০ এর অধিক যন্ত্রচালিত যানবাহন ছিল। জেলার বিভিন্ন পাহাড় গুলিতে ও পাহাড়ি জমি গুলিতে ফলের ও বৃক্ষের বাগান-বাগিচাগুলি উন্নতির দিকে লক্ষ্য করা গিয়েছিল। চেংগী, মাইনী এ সকল উপত্যকায় কলের লাঙলের চাষ ও জলসেচ করার পাম্প মেশিনের ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছিল। পাহাড়ি ডাক্তার ও নার্সরা চিকিৎসা সেবা দিতে পারছিল। এ সব উন্নয়ন ঐ জেলার চাকমাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তুলছিল। রাঙ্গামাটি জেলাতেও ক্রমে ক্রমে নানা উন্নয়ন সম্ভব। একই কথা বান্দরবানের চাকমাদের ও অন্যান্যদের জন্য প্রযোজ্য।

এখনো লেখা-লেখির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন কিনা? আপনার সুনাম সুকীর্তি পাহাড়ে আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে। জীবনের ঊষালগ্নে কবিতা লেখার শুরুটা হলো কিভাবে? সে সম্পর্কে স্মরণীয় ঘটনা শোনাবেন কি?

সুগত চাকমাঃ এ মূহুর্তে চাকমা বর্ণে ও ভাষায় শিশুতোষ সাহিত্য, ইংরেজী ও বাংলাতে পার্বত্য চট্টগ্রামে নানা ভাষা ও বর্ণমালা, এখনকার বৌদ্ধ ধর্ম (ও তার অনুসারীদের উত্থান), ঐতিহ্যবাহী সমাজ-সংস্কৃতি-ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ে লেখালেখি (গবেষণা মূলক প্রবন্ধসহ) করছি। আমার জীবনের ঊষলগ্নে ৫০ –এর দশকে এ সকল জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্য ও বর্ণাঢ্য সংস্কৃতি আমাকে খুব কৌতুহলী করে তুলেছিল। আমার মা মিসেস সরলা তালুকদার (সনাক্কু) আমাকে শিশু বয়সে বহু জনপ্রিয় বাংলা কবিতা মুখস্থ করিয়াছিলেন। ৬০ –এর দশকে বিরাজ মোহন বাবু (সরোজ আর্ট) প্রেস আনলেন, পরে পার্বত্য বাণী পত্রিকা বের করলেন। তার জ্যেষ্ঠ ছেলে কালী শংকর দেওয়ান বাবুর সাথে শৈশব থেকে আমার বন্ধুত্ব ছিল। আমরা অনেক জুমিয়ে ভাষা প্রচার দপ্তর (জুভাপ্রদ) বানালাম। তারপর ৭০ –এর দশকে বিভিন্ন ম্যাগাজিন প্রকাশনা করতে লাগলাম। আরও কয়েকটি সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠন হলো। গিরিসুর নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন হলো। শিল্পীরা সবাইকে আনন্দ দিয়ে গান ও নাচ করতে লাগলো।

আমাদের চাকমা ভাষা ও সাহিত্যের ভবিষ্যত রচনায় বর্তমানে আপনার কোন পরিকল্পনা আছে কি?

সুগত চাকমাঃ ২০১৭ সালের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য চাকমা ভাষায় সুন্দর সুন্দর হৃদয়গ্রাহী পাঠ্যবই জাতীয় পাঠ্য পুস্তক বোর্ড, ঢাকা কর্তৃক ছাপা হয়েছিল। এখনো বিভিন্ন শ্রেণীর ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য হচ্ছে। সেগুলি উচঊঙ- এর অফিসগুলির মাধ্যমে বিতরণও শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে চাকমা ভাষায় ১ম শ্রেনী ও ২য় শ্রেণীর বইও ছাপা হয়ে বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। আগামী কিছুদিনের মধ্যে নানা উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে চাকমা ভাষায় প্রকাশিত (পাঠ্য) বইয়ের সংখ্যা লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌছবে, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষায় বইগুলির ক্ষেত্রেও একই ধরণের কথা প্রযোজ্য। কম্পিউটার/ল্যাপটপ দিয়ে চাকমা বর্ণ টাইপিং-এ দেশে বিদেশে উন্নতি হচ্ছে। ইতিমধ্যে চাকমা বর্ণ ইলেক্ট্রনিক গতিতে চারদিকে বিস্তৃতি লাভ করছে।

ত্রৈমাসিক বোধিধারা পাহাড়ের একমাত্র ও সর্ব প্রথম নিয়মিত বৌদ্ধ সাময়ীকি হিসেবে প্রায় একযুগ টিকে আছে। এতে বেশী কিছু বলা হলো কি?

সুগত চাকমাঃ বোধিধারা নামটি খুবই সুন্দর ও চিত্তাকর্ষক নাম। এক যুগ ধরে মৈত্রীময় চিত্তে কল্যাণকর ধ্যান ধারণা পাঠক সাধারণকে প্রদানের জন্য একে আবারও সশ্রদ্ধচিত্তে অভিনন্দন জানাই।

বোধিধারা পত্রিকাটিকে আরও সুন্দর ও সাবলিল করে তোলার জন্য আপনার পরামর্শ চাই। এ পত্রিকায় পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।

সুগত চাকমাঃ বোধিধারা সম্পাদক, লেখক ও পাঠকদেরকে মৈত্রীপূর্ণ শুভেচ্ছা জানিয়ে বলবো, আপনারা বোধিধারা সাময়িকীটি পড়ুন এবং তাতে ভাল ভাল লেখা লিখুন। তার ধারাকে আরো সামনে এগিয়ে নিন।

পরিবারের পক্ষ থেকে আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ।

সুগত চাকমাঃ খুব সুন্দর এই প্রশ্নপত্রটি তৈরি করার জন্য বোধিধারা-কে অশেষ ধন্যবাদ জানাই।