আজকের বিশ্বে অর্থনৈতিক পরশক্তির অধিকারী দেশগুলোর তালিকায় জাপানের নাম শীর্ষ স্থানীয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মর্মান্তি স্মৃতিকে বুকে নিয়ে জাপানীরা অদম্য-মনোবল সৎসাহস এবং বুদ্ধের শিক্ষাকে পূঁজি করে আজ বিশ্ব সমাজে শান্তিবাদী জাপান নামে অভিহিত হচ্ছে। জাপানকে ইতিপূর্বে যুদ্ধাবাজ নামে অভিহিত করা হতো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জাপানের নগরী হিরোশিমা ও নাগাসিক ধ্বংসস্তুপ পরিণত হয়। যুদ্ধের দ্বারা বিশ্বজয়ের নেশা ছেড়ে বুদ্ধের স্নিগদ্ধছায়ায় মনস্তাত্তিক ভাবে বিশ্বজয়ে জাপান আজ অভিনিবিষ্ট। যেই বিশ্ব বিধ্বংসী পারমাণবিক বোমাকে ঘিরে ভয়ের শেষ নেই।

সেই বোমা একমাত্র এবং সর্বপ্রথম জাপানেই ফেলা হয়। যা ভেবে বিবেচক মানুষ মাত্রেই আশ্চর্য না হয়ে পারেন না। জাপান জাতি তাই রুখে দাঁড়ালো পরমানু বোমার বিপক্ষে। দাঁড়ালো শান্ত, শোভন, সমৃদ্ধ ও খুধী জগত পড়ার পক্ষের। সমৃদ্ধ নগরীর মধ্যে ওসাকা, কোবে, ইয়োকোহামা, নাগোয়া, কিওটো অন্যতম। রাজধানীর নাম টোকিও। কিয়োটা এবং নারা হলো বৌদ্ধ ঐতিহ্য মণ্ডিত নগরী। এই দুটো নগরীতে আনবিক বোমা নিক্ষেপের উদ্দেশ্য থাকলেও ধর্মের উপর আঘাত না করে অর্থনীতির উপর আঘাত হানার উদ্দেশ্য অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হিরোশিমা ও নাগাসিকের আঘাত হানা হয়।

ছবিঃ এটম বোমার অগ্নেয়গিরি

নিমিষেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় নগর দুটো। এই Industrial City ধ্বংস হলে জাপানীরা পরিচিতি পেলো Industrila Nation হিসেবে। বুদ্ধের স্বাবলম্বন এবং কর্মবাদ তারা তাদের জাতীয় জীবনের প্রতিফলিত লাভ করলো। আজকর পৃথিবীতে বৌদ্ধ সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক উৎকর্ষের সাধনে জাপানী বৌদ্ধদের অবদান অভাবনীয় বলা যায়। এদেশে খ্রিষ্ট ধর্ম প্রবেশ করে। কিন্ত মাটিতে শিকড় ছড়ানোর আগেই তাকে উৎখাটন করা হয়। ১৫৯৭ সালে ২৬শত বিদেশী খ্রীষ্টানকে নাগাসিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। ১৬২২ সালে ৫০ জনকে তার দু বছর পর জীবন্ত খবর দেওয়া হয় টোকিওতে। ৩০০০ খ্রীষ্টানকে অল্পদিনের ব্যবধানে বধ করা হয়। জেলে এবং নির্বাচনে পাঠানো খ্রীষ্টানদের সংখ্যা ছিল আরো বেশি। ১৬৩৩ সালে আরো ৩০ জন খ্রীষ্টান মিশনারীকে হত্যা করা হয়। উল্লেখ্য, জাপানী কম্যুনিষ্ট পাটির বড় সমর্থক এই খ্রীষ্টান সম্প্রদায়।

আজকের বিশ্বে খ্রীষ্টান মিশনারীরা শুধু জাপান নয় কোরিয়া, ভিয়েতনাম সহ বিভিন্ন বৌদ্ধ দেশে বৌদ্ধদের সাথে পাল্লা দিয়ে তাদের শেকড় ছড়াতে উদ্গ্রীব হয়েছে।অথচ বৌদ্ধরা ধর্ম প্রচারের এরূপ নগ্ন প্রয়াস কখনো করেনি। বৌদ্ধ ইতিহাসে দেখি পাক-ভারত উপমহাদেশে বৌদ্ধরা শুধুই ধ্বংস হয়েছে কাউকে ধ্বংস করেনি। জাপানিরা বৌদ্ধ ধর্মকে সন্দেহের চোখে দেখেনি বরং বলা যায় বৌদ্ধ ধর্মকে তারা নিজেদের ধর্ম হিসেবেই গ্রহণ করেছে।

নানা পেরিয়ড (৭১০-৭৯৪) জাপানে বৌদ্ধ ধর্ম রাষ্ট্রধর্মের মর্যাদা পায়। যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাষ্ট্রধর্ম আইনটি অকার্যকর করা হয়। জাপানে প্রায় ৪ লক্ষ ধর্মগুরু এবং বৌদ্ধ বিহারের সংখ্যা ২ লাখের মতো। এদেশে যেমন, Zen, Lotus, Tendai, Ome ইত্যাদি। তা’ সত্তেও তারা গঠনমূলক ক্ষেত্রে সংঘবদ্ধ এবং অবিভাজ্য।

ভারত থেকে বৌদ্ধ ধর্ম তিব্বতে যায়। ক্রমান্বয়ে চীন ও কোরিয়ার পথ পাড়ি দিয়ে জাপানে বৌদ্ধ ধর্ম যায়। (৫৩৮-৫৫৩) সালে উত্তর কোরিয়ার রাজা জাপানের সম্রাটকে একটি বুদ্ধ মূর্তি উপহার দেয়। যা উভয় দেশের জন্য মৈত্রীর প্রতীক হয়ে আছে।