বোধিসত্ত্ব একসময় বারাণসীর এক ব্রাহ্মণঘরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।তখন তার নাম ছিল অকীর্তি। পরে তার এক বোন হয়েছিল। নাম ছিল যশোবতী। ব্রাহ্মণের ছিল অঢেল ধন-সম্পদ। পুরুষের পর পুরুষ সঞ্চিত ধন। তাই অকীর্তি ছিলেন ধনীর পুত্র। যশোবতী ছিল ধনীর মেয়ে।

ষোলো বছর বয়স তখন অকীর্তির। তক্ষশিলা থেকে বিদ্যাশিক্ষা করে বিদ্বান হয়ে বারাণসী ফিরলেন তিনি। কিছুকাল পরেই মা-বাব মারা গেলেন। অকীর্তি শ্রাদ্ধকর্ম সারলেন। সবকিছুর দায়িত্ব এসে তার ওপর। একদিন হঠাৎ তার মনে হল- এত ধন-দৌলত তো চোখে দেখতে পাচ্ছি। কিন্ত যারা এসব সংগ্রহ করলেন, সঞ্চয় করলেন, তারা কোথায়? এগুলো পড়ে রইল। আর তারাই চলে গেছেন। মানুষ চলে যায়, তবু এই ধনদৌলতের মোহ ছাড়তে পারে না। সংগ্রহের জন্য কত না কৌশল অবলম্বন করে। কিন্ত কতটুকু ভোগ করতে পারে?

ভাবতে-ভাবতে মনে তার বিতৃষ্ণা জাগল। মৃত্যুর পরেও যা সঙ্গে যাবে না, তাকে আকরে ধরে লাভ কী? যশোবতীকে ডেকে বললেন- বোন, এই ধন-সম্পদ তুমি ভোগ করো। ---আর তুমি? ---আমি গৃহত্যাগ করব। বনবাসী হয়ে তপস্যা করব? ---বেশ বললে দাদা। তুমি আমাকে তোমার সেই বোনই পেয়েছ। তুমি যা ছেড়েছুড়ে দিয়ে যাবে, আমি তা আকরে থাকব। আমিও তোমার সঙ্গে বনে যাব। অকীর্তি তখন ধন দান করতে শুরু করলেন। সাতদিন ধরে দান করেও ফুরোয় না দেখে বাড়ির সব দরজা খুলে দিলেন। বললেন- যার যা খুশি নিয়ে যাও। ---এই বলে তিনি বারাণসী ছেড়ে চলে গেলেন। পিছনে বোন যশোবতী।

নদী পেরিয়ে তিনি চলে গেলেন রমণীয় এক স্থানে। পর্ণশালা নির্মাণ করে থাকতে লাগলেন। পুরোপুরি বনবাসী। গাছের ফল-মূল মাত্র আহার। বোনও তাই। নগর গ্রামের প্রতিটি মানুষ অকীর্তিকে খুব ভালোবাসত। তারা যখন দেখল, অকীর্তি প্রব্রজ্যা নিয়েছে, তারাও প্রব্রজ্যা নিল। তার কাছে আসতে শুরু করল। ধর্মকথা শুনতে লাগল।

অকীর্তি দেখলেন বনে এসেও নিস্তার নেই। উপহার, সম্মান, অনুচর। চেয়েছিলেন একা থাকতে, অথচ তা আর হচ্ছে না। যা ত্যাগ করতে চান, সে যেন পিছু নিয়েছে। তাই একদিন কাউকে কিছু না বলে তিনি চলে গেলেন দ্রাবিড় রাজ্যে। সেখানে কাবেরী বন্দরের কাছে একটা আশ্রম করে ধ্যানে বসলেন। দেখতে দেখতে সেখানেও জমে গেল বহু অনুচর। মনে মনে খুব বিরক্ত হলেন তিনি। এবার তিনি সে আশ্রমও ছাড়লেন। নিরালা জায়গার সন্ধানে আকাশপথে চললেন। ভাসতে ভাসতে এলেন কারদ্বীপে। তখন এই কারদ্বীপের নাম ছিল অহিদ্বীপ। দ্বীপ জুড়ে বিশাল বিশাল কার গাছ।

নামলেন সেই দ্বীপে। আসন পাতলেন একটা কারদ্বীপের নিচে। যশোবতী দাদাকে দেখতে না পেয়ে খুজতে বের হল। দ্রাবিড়ো পর্যন্ত এল। কিন্ত এখান থেকে দাদা যে কোথায় চলে গেলেন কেউ বলতে পারল না। তাই বাধ্য হয়ে পুরোনো আশ্রমে ফিরে এল সে। ওদিকে অকীর্তি একমনে কঠোর তপস্যা করে চললেন। আসন ছেড়ে তিনি উঠতেন না। বসে বসেই গাছের দিকে হাত বাড়িয়ে যদি ফল পেতেন, তবে তাই খেতেন। না পেলে গাছের পাতা জলে সিদ্ধ করে সেই জল খেয়ে খিদে মেটাতেন।

তার তপস্যায় ইন্দ্রের আসন টলে উঠল। ---কে আবার তার সিংহাসন দখল করতে চাইছে? মর্ত্যের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলেন অকীর্তিকে। একবার পরীক্ষা করে দেখা যাক, কী উদ্দেশ্যে এমন তপস্যা করছে অকীর্তি। ইন্দ্রত্ব চায়? না অন্য কিছু?—এই ভেবে তিনি সামান্য এক ভিখারী ব্রাহ্মণের বেশ ধরে এলেন সেখানে।

অকীর্তি তখন কারপাতা সিদ্ধ করে জল ছেকে রেখেছেন। ঠাণ্ডা হলে খাবেন। এমন সময় তিনি এলেন তার সামনে। বললেন- আমার দারুণ খিদে, কিছু খেতে দাও। সঙ্গে সঙ্গে অকীর্তি তাকে সাদর অভ্যর্থনা করে বসালেন। তারপর সেই লবণহীন সিদ্ধ জল তাকে দিলেন। শত্রুও তা পান করে সেখান থেকে চলে গেলেন। অকীর্তি সেদিন আর নিজের জন্য নতুন করে পাতা সিদ্ধ করলেন না। দ্বিতীয় দিনও শত্রু আবার একই ঘটনা ঘটালেন। দেখে মনে হল, এইভাবে অতিথি সৎকারের সুযোগ পেয়ে নিজে কতই না কৃতার্থ হয়েছেন। তৃতীয় দিন। একইভাবে পাতা সিদ্ধ করে জল রেখেছেন অকীর্তি। দুদিন গেছে অনাহারে। পাত্র নিয়ে এবার খেতে যাবেন, ব্রাহ্মণবেশে শত্রু এলেন- যেন এখপেট খিদে নিয়ে।

অকীর্তি সঙ্গে সঙ্গে পাত্র তার দিকে তুলে ধরলেন। মুখে বিরক্তির কোনো চিহ্ন নেই, পরিবর্তে যেন খুশিতে ঝলমল করে উঠল। ভাবতে লাগলেন, কত সৌভাগ্যবান তিনি! শরীরের দুর্বলতার কথা এবারও মনে এল না। স্তম্ভিত দেবরাজ। এবার ছদ্মবেশ সরিয়ে নিজের মূর্তি ধরলেন। জিজ্ঞেস করলেন- তাপস, এই গরমে নিজেকে অতুক্ত রেখে কিসের জন্য এত কঠোর তপস্যা?

অকীর্তি বললেন- দেবরাজ। আমি অতুক্ত নই। অতিথির সেবা করেই আমার খিদে মিটে গেছে। বরং এইভাবে সেবা করতে পেরে আমি ধন্য হয়েছি। আমি চাই, পৃথিবীর রূপ-রস ইত্যাদিতে আমার যেন কোনো আসক্তি না জন্মায়। আমি মুক্তি পেতে চাই। আমি মোহ-মায়াকে জয় করতে চাই। যেন কখনো ক্রোধের বশীভূত না হই। সর্বপ্রাণীর মঙ্গল চিন্তা আমি যেন সব সময় করতে পারি। আর চাই অক্ষয় ভাণ্ডার, যাতে আমি অকাতরে জীবনভোর দান করে যেতে পারি হাসিমুখে।

অকীর্তি যে যে বর চাইলেন, দেবরাজ সব-কিছু দিয়ে চলে গেলেন। ইন্দ্র পরাভব মানলেন আর অকীর্তি যশ লাভ করলেন।